ছবির হাটসিলেট

লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়ায় অগ্নিকাডে ৪ একর বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে

সিলেট ব্যুরোচীফঃ মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়ায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অগ্নিকান্ডের ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। গত ২৪ এপ্রিল বেলা ১২টার দিকে স্টুডেন্ট রিমেটরি এলাকায় আগুন ধরে। এতে প্রায় ৪ একর বনাঞ্চল পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্থ হয় প্রাকৃতিক বনের পরিবেশ ও পশুপাখি। এর কয়েক দিন আগেও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ আগুনে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

লাউয়াছড়ার আগুনের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এগুলো পূর্ব পরিকল্পিতভাবে সাজানো কার্যক্রমের বাস্তবায়ন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সরেজমিন অগ্নিদগ্ধ এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায় ধারালো দা দিয়ে বনাঞ্চলের বাঁশ ও গাছ কাটা হয়। পাতা শুকোনোর পর সময় বুঝে বনের কয়েকটি জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শুকনো পাতায় আগুন খুব অল্প সময়ে বিস্তার লাভ করে।
এ আগুনে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ক্ষতির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বন্য প্রাণী। এ বনাঞ্চলে বানর, হরিণ, চিতা বাঘ, শাপ, নানা জাতের পাখিসহ বিভিন্ন ধরণের প্রাণীর বসবাস। শ্রীমঙ্গল হতে কমলগঞ্জ সড়কের পাশবর্তী এলাকায় এ অংশটি ভুমিধস্যুদের নজরে রয়েছে। বনবিভাগের উদাসীনতায় এবং আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ অঞ্চলটি দখল করে দেশকে অক্সিজেন সংকটে ফেলতে চায় ভুমিধস্যুরা।
ইতি পূর্বেও লাউয়াছড়ার সংরক্ষিত গাছ কাটার অভিযোগ, বন্য প্রাণী শিকারের জমি দখল সহ নানা অভিযোগ ছিলো পরিবেশবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের। সাম্প্রতিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা অভিযোগকে আরো ঘনীভূত করছে। বনবিভাগীয় কর্মকর্তাদের উদাসীন বক্তব্য পরিবেশবাদীদের অভিযোগ রক্ষকের ভক্ষক ভুমিকারই প্রমাণ দিচ্ছে।

এদিকে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আগুন লাগার জন্য বন বিভাগের তিন জনের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে ১০টি সতন্ত্র পয়েন্ট উল্লেখ করেছে। তার ৭-৮নং পয়েন্টে উল্লেখ করা হয়েছে ইচ্ছেকৃতভাবে আগুন লাগার ঘটনার প্রমাণ সেভাবে মেলেনি, তবে বনে কোন ময়লা বা আগাছায় কোনভাবেই আগুন দেওয়া যাবে না বলে পূর্বেই নির্দেশ দিয়েছিলো বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। তাই আগুন লাগার ঘটনায় নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে।
এ-ঘটনায় দায় দেওয়া বনবিভাগের তিনজন হলেন বাঘমারা ক্যাম্পের বনপ্রহরী মোতাহার হোসেন, লাউয়াছড়া বিট অফিসার মিজানুর রহমান এবং সহযোগী সদস্য (কমিনিউটি পেন্ট্রোল দল) মো. মহসিন। এই তিনজন দায়িত্ব পালন না করা, আগুন লাগার পর তা নেভানোর চেষ্টা না করে ঘটনাস্থল থেকে দূরে চলে যাওয়া, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত না করাসহ বিভিন্ন কারণে তদন্ত কমিটি এই ঘটনার জন্য তাদেরকেই দায় দিয়েছে।
এছাড়াও তদন্ত কমিটি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বন বিভাগের স্টাফদের ওপর তদারকি বাড়াতে হবে। প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া গাছ ও লতাপাতার প্রতি যত্নশীল হতে হবে। বনের উন্নয়নমূলক কাজের সময় গ্যাস লাইট বা দিয়াশলাই সাথে রাখা যাবে না। অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম সাথে রাখতে হবে। সেই সাথে আশপাশের ফায়ার স্টেশনের নম্বর রাখতে হবে।

ফরেস্ট গার্ড মোঃ মুহিতুল ইসলাম আগুন সম্পর্কে প্রথমে কিছু বলতে চান নি। এক ধরনের জোর করে তার কাছ থেকে আগুন লাগার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আগুন লাগার সময় নামাজে ছিলেন, পরে আগুন দেখে তা নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমান খুবই সামান্য, ০.৫ একর জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লাউয়াছড়া পরিদর্শনে আশা সজিব ইসলাম ও আরাফাত হোসেন রিমন বলেন সবুজে ঘেরা প্রকৃতিক বনায়ন ভালো লাগে, বনে আগুন লাগায় প্রকৃতির ক্ষতি হয়েছে। এখানে পশুপাখির ক্ষতি হয়েছে এবং মারাও গেছে। এটি খুবিই দুঃখজনক। প্রকৃতিক বনায়ন পুড়ানো হয়েছে, যারা পুড়িয়েছে তাদের যেনো দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
কমলগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জুয়েল আহমদ বলেন লাউয়াছড়ায় যে আগুন লেগেছে আমার মনে হয়েছে এটি পরিকল্পিত, এই কারণে একাধিক জায়গা থেকে আগুন ধাউ-ধাউ করে জ্বলে উঠেছে। এবং এই বন ধ্বংস করার জন্য দখলবাজরা এমনটি পরিকল্পনা করেছে। আমরা যারা এই এলাকার জনগণ ও জনপ্রতিনিধিরা লাউয়াছড়া বন রক্ষার্থে সচেষ্ট থাকবো। আমরা প্রত্যাশা করি দ্রুত এই বিষয়টির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, প্রতিবেদন হাতে পেয়েছেন। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে বন বিভাগের নিয়ম অনুসারে দায়িত্বে অবহেলার জন্য ৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এবং ভবিষ্যতে যেন এমন অনাকাঙ্খিত কিছু না ঘটে সেজন্য তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করছে তা আমলে নিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। এবং ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান খুবই সামান্য। এক থেকে দের একর জায়গা পুড়েছে। এটি দ্রুতই প্রাকৃতিক ভাবে রিকভার হবে এবং বনায়নের অংশে বনায়ন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ এপ্রিল লাউয়াছড়ার স্টুডেন্ট ডরমেটরি অংশের পাশে বাঘমারা এলাকায় কাজ করছিলেন কিছু শ্রমিক। সেখানে আগাছা পরিষ্কার করে গাছ লাগানোর জন্য বন বিভাগের অধীনে কাজ করছিলেন তারা। সে জায়গায় দুপর ১২টার দিকে হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয় এবং ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে বন বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। এই ঘটনার তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে বন বিভাগ।

Tags
আরো দেখুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
Close