সম্পাদকীয় ও কলাম

বঙ্গবন্ধু মানেই ‘সংগ্রাম’

কিছু কিছু মৃত্যুর ওজন পাখির পালকের মতো হালকা। আবার কিছু কিছু মৃত্যুর ওজন হিমালয় পর্বতের চেয়ে ভারী। পাখির পালকের মতো হালকা মৃত্যুর কথা কেউ মনে রাখে না। মনে রাখে তার বিপরীতটিকে। আজ ১৫ আগস্ট। এই দিনটিকে জাতি হিসেবে আমরা কখনো ভুলে যেতে পারি না। কেননা, হিমালয় পর্বতমালাও এ মৃত্যুতে মুহূর্তের জন্য হলেও স্তম্ভিত হয়েছিল, হয়েছিল বাকরুদ্ধ। গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত করে করেছিল শোক প্রকাশ। ১৯৭৫ সালের এই দিনে একদল পথভ্রষ্ট গুলি করে হত্যা করে বাঙালি জাতির প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কবিরা জন্ম নেন না। তারা নির্মিত হন। বঙ্গবন্ধু নির্মিত হয়েছিলেন। কবিদের মৃত্যু নেই। আর সে কারণেই কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় নির্মিত এই রাজনীতির কবি এখনো জীবিত। যত দিন জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের মাঝে বেঁচে থাকব, বেঁচে থাকবেন আমাদের রাখাল রাজা, প্রিয় ব্যক্তিত্ব শেখ মুজিব। যারা হত্যা এবং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন, তারা বুঝতেও পারেননি এই মৃত্যু কতটা ভারী হয়ে চেপে বসতে পারে এ দেশের প্রায় প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয় তন্ত্রিতে। আজও আমরা শোকের কাফেলা নিয়ে এই মহান মানুষটির খোঁজে পথকে চলি। সম্ভবত এ চলার কোনো শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ছোট গল্পের মতো, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। তার ব্যক্তিত্ব ও নির্ভীকতা হিমালয়ের মতো। তার মধ্য দিয়েই আমার হিমালয় দর্শন।’ কাস্ত্রোর এই কথার মধ্য দিয়েই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধুর উচ্চতা, বিশালতা এবং সাহসী মানসিকতা। আর তাই আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধু শব্দের অর্থই হচ্ছে ‘সংগ্রাম’। যে সংগ্রাম সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে শেখায়। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ! যে ভাষণ একটি ঘুমিয়ে থাকা জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে দিয়েছে একটি মানচিত্র, একটি দেশ এবং জাতীয়তাবাদের অমূল্য এক মহাকাব্য। সেদিন দুর্বৃত্তরা কেবল জনক এবং তার স্বজনদেরই হত্যা করেনি, গোটা বাঙালি জাতির স্বপ্নকে হত্যার চেষ্ট চালিয়েছিল। কিন্তু তা তারা পারেনি। তারা জানত না দর্শনকে গুলি করে হত্যা করা যায় না। ধারণকৃত দর্শন সময়ের তালে তালে পরম্পরায় ছড়িয়ে পড়ে আপন গতিতে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন একটি দর্শন এবং সে দর্শন আজ ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার শিরা-উপশিরায়। আমাদের রক্তপ্রবাহে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে, যেদিন বাংলার কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে।’ সময় গড়িয়েছে অনেক। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে? সত্য স্বীকারে কার্পণ্য না করেই বলা যায়, আমরা বিচ্যুত হয়েছি। আমরাই তার স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছি। দুর্নীতির পচা নর্দমায় নিমজ্জিত হয়ে তার দর্শনকে কলুষিত করেছি। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমরা তার দর্শন ও তাকে কালিমালিপ্ত করব; যা মানুষ হিসেবে আমরা কখনো করতে পারি না। বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত বাণী থেকে উদ্ধৃত করে পরিশেষে বলতে হয়, তিনি রক্ত দিয়েই রক্তঋণ শোধ করে যাবেন। তিনি তা করেছেন। এখন আমাদের সময়। আজকের এই দিনে দেশ ও জাতির কাছে একটিই জিজ্ঞাসা আমরা কখন আমাদের সেই ঋণ শোধ করব।

আরো দেখুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button
Close